ইতিহাসের এক হারানো অধ্যায়: ফারাও আখেনাতেন
যে ফারাওকে মৃত্যুর পর ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল
খ্রিস্টপূর্ব ১৩৩৬ সাল। মিশরের ফারাও আখেনাতেন সবেমাত্র মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই পুরোহিতেরা এবং নতুন ফারাওয়ের দরবারিরা এক অসাধারণ সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁরা সারা মিশরের মন্দির, স্তম্ভ ও দেয়াল থেকে আখেনাতেনের নাম মুছে ফেলতে শুরু করলেন। তাঁর প্রতিকৃতি মুছে দেওয়া হলো। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নতুন রাজধানী শহর আমার্না পরিত্যক্ত হলো এবং পরবর্তী ফারাওদের তালিকায় তাঁর নামও স্থান পেল না।
ইতিহাস থেকে একজন মানুষকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার এই প্রচেষ্টা প্রায় সফল হয়েছিল। পৃথিবী যেন আখেনাতেনকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু উনিশ শতকে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা যখন আমার্নার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করলেন, তখন ইতিহাসের এই মুছে দেওয়া অধ্যায় আবারও আলোর মুখ দেখল।
কে ছিলেন আখেনাতেন, আর কী করেছিলেন তিনি?
আখেনাতেনের পূর্বনাম ছিল আমেনহোতেপ চতুর্থ। তিনি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৩৫৩ থেকে ১৩৩৬ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ১৭ বছর মিশর শাসন করেছিলেন। রাজত্বের শুরুতে তিনি ছিলেন আর দশজন ফারাওয়ের মতোই একজন শাসক। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি এমন এক সিদ্ধান্ত নিলেন, যা মিশরের প্রায় তিন হাজার বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে আমূল চ্যালেঞ্জ জানাল।
তখন মিশরে শত শত দেবতার উপাসনা প্রচলিত ছিল। প্রতিটি শহরে ছিল নিজস্ব দেবতা, দেবতাদের জন্য নির্মিত বিশাল মন্দির এবং সেই মন্দিরগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শক্তিশালী পুরোহিতগোষ্ঠী।
এমন পরিস্থিতিতে আখেনাতেন ঘোষণা করলেন, একমাত্র আতেন—সূর্যের চাকতি—হলেন উপাসনার প্রধান ও একমাত্র দেবতা। তাঁর ধর্মীয় সংস্কার প্রচলিত দেবদেবীর উপাসনাব্যবস্থাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাল।
মিশরের প্রথম একেশ্বরবাদী বিপ্লব
আখেনাতেনের এই পদক্ষেপ কেবল ধর্মীয় পরিবর্তন ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মিশরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামো বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টাও।
প্রচলিত দেবতাদের উপাসনা সীমিত ও দমন করার উদ্যোগ নেওয়া হলো। দেবতা আমুনের বিশাল মন্দিরের পুরোহিতেরা, যাঁরা মিশরের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম ছিলেন, তাঁরা ক্রমে তাঁদের প্রভাব ও ক্ষমতার ওপর আঘাতের মুখে পড়লেন।
আখেনাতেন রাজধানী থিবস থেকে সরিয়ে নীল নদের তীরে একটি নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করলেন। শহরটির নাম দিলেন আখেতাতেন, যা বর্তমানে আমার্না নামে পরিচিত। এই নতুন রাজধানী ছিল তাঁর ধর্মীয় সংস্কারের কেন্দ্র। সেখানে আতেনের উপাসনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হলো এবং প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন উপাসনাপদ্ধতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলল।
এই ধর্মীয় পরিবর্তনকে প্রাচীন বিশ্বের এক উল্লেখযোগ্য একেশ্বরবাদী পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেক গবেষক পরবর্তী ধর্মীয় ইতিহাসের সঙ্গে আখেনাতেনের সংস্কারের তুলনা করেছেন। কেউ কেউ ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলামের একেশ্বরবাদী ধারণার সঙ্গে এর সম্ভাব্য ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেছেন। তবে আখেনাতেনের ধর্মীয় সংস্কার থেকে পরবর্তী এই ধর্মগুলোর একেশ্বরবাদের সরাসরি বিকাশ ঘটেছে—এমন কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
আমার্নার শিল্পকলা: ইতিহাসের সবচেয়ে বিপ্লবী শিল্পরীতি
আখেনাতেনের শাসনামলে মিশরের শিল্পকলায় এক বিস্ময়কর পরিবর্তন দেখা যায়। হাজার বছরের প্রচলিত মিশরীয় শিল্পরীতিতে ফারাওকে সাধারণত আদর্শ শারীরিক গঠনসম্পন্ন, শক্তিশালী ও দেবতুল্য রূপে উপস্থাপন করা হতো। কিন্তু আমার্নার শিল্পে আখেনাতেন ও তাঁর পরিবারের চিত্রায়ণে দেখা গেল এক ভিন্নধর্মী উপস্থাপনা।
শিল্পকর্মে তাঁকে স্ত্রী নেফারতিতি ও সন্তানদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ পারিবারিক মুহূর্তে দেখা যায়। কোথাও তিনি সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, কোথাও নেফারতিতির পাশে বসে আছেন, আবার কোথাও সূর্যের আলোয় মুখ তুলে প্রার্থনা করছেন।
এই শিল্পরীতি ছিল তৎকালীন মিশরীয় শিল্পের প্রচলিত ধারা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা। ফারাওয়ের পারিবারিক জীবন, মানবিক অভিব্যক্তি এবং আতেনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে শিল্পে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এ কারণেই অনেক আধুনিক শিল্পসমালোচক আমার্নার শিল্পধারাকে এক ধরনের প্রাচীন শিল্পবিপ্লব হিসেবে দেখেন। কেউ কেউ একে ইউরোপের রেনেসাঁর প্রায় তিন হাজার বছর আগের একটি শিল্পিক নবজাগরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে এ তুলনা মূলত শিল্পের পরিবর্তনের ব্যাপকতা বোঝানোর জন্য; দুটি আন্দোলনের প্রকৃতি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এক ছিল না।
মৃত্যু এবং ইতিহাস থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া
আখেনাতেনের মৃত্যুর পর মিশরের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। তাঁর উত্তরসূরি তুতেনখাতেন পরবর্তীকালে তুতেনখামুন নামে পরিচিত হন। তাঁর শাসনামলে পুরোনো ধর্মীয় ঐতিহ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং আতেনকেন্দ্রিক ধর্মীয় সংস্কার থেকে সরে আসা হয়। নিজের নামও পরিবর্তন করে তিনি তুতেনখামুন গ্রহণ করেন, যা প্রচলিত দেবতা আমুনের প্রতি আনুগত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তী সময়ে আখেনাতেনের স্মৃতি ও শাসনের চিহ্ন মুছে ফেলার প্রচেষ্টা আরও জোরালো হয়। বিভিন্ন স্থাপনা থেকে তাঁর নাম ও প্রতিকৃতি অপসারণ করা হয়। তাঁর শাসনকালকে পরবর্তী রাজবংশের ঐতিহাসিক বিবরণে যথাযথভাবে স্থান দেওয়া হয়নি। তাঁকে কখনো কখনো শত্রু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেন তাঁর নাম উচ্চারণ করাও অনাকাঙ্ক্ষিত।
আখেনাতেনের সমাধি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর রাজকীয় সমাধির অবস্থান এবং তাঁর দেহাবশেষের পরিচয় নিয়ে গবেষণা হয়েছে, কিন্তু তাঁর শেষ পরিণতি সম্পর্কে সব প্রশ্নের চূড়ান্ত সমাধান এখনো পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ ধারণা করেছেন, তাঁকে যথাযথভাবে সমাধিস্থ করা হয়নি। তবে এ দাবির পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
প্রাচীন মিশরীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাসে মৃত্যুর পরের জীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই সমাধি ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অধিকার হারানোকে গুরুতর অপমান হিসেবে বিবেচনা করা হতো। আখেনাতেনের পরিণতি নিয়ে বিতর্কের পেছনে এই বিশ্বাসও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
মোজেস ও আখেনাতেন: সবচেয়ে বিতর্কিত সংযোগ
আখেনাতেনকে ঘিরে ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বিতর্ক হলো বাইবেলের মোজেসের সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য সম্পর্ক।
সিগমুন্ড ফ্রয়েডসহ কয়েকজন চিন্তাবিদ ও গবেষক আখেনাতেনের ধর্মীয় সংস্কার এবং মোজেসের কাহিনির মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজেছেন। তাঁদের আলোচনায় উঠে এসেছে একেশ্বরবাদ, ধর্মীয় মতাদর্শের সংঘাত এবং মিশর থেকে প্রস্থান করার মতো বিষয়।
কিছু তত্ত্বে বলা হয়েছে, মোজেস হয়তো আখেনাতেনের ধর্মীয় ধারণায় প্রভাবিত হয়েছিলেন অথবা আতেনের উপাসনার কোনো অনুসারী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। আরও কিছু অনুমানে আখেনাতেনের ধর্মীয় সংস্কার ও মোজেসের ঐতিহ্যের মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এসব ধারণার পক্ষে পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। আখেনাতেন ও মোজেসের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক ছিল, কিংবা মোজেস আখেনাতেনের অনুসারী হিসেবে মিশর থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ইতিহাসবিদেরা পাননি। উপরন্তু, মোজেসের জীবনকাল নিয়েও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ফলে এই তত্ত্বগুলোকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের পরিবর্তে বিতর্কিত অনুমান হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
তবু প্রাচীন বিশ্বের ধর্মীয় ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে আখেনাতেনের সংস্কার এবং পরবর্তী একেশ্বরবাদী ঐতিহ্যের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা আজও গবেষক ও পাঠকদের আগ্রহ জাগায়।
শেষ কথা: ইতিহাস কি সত্যিই কাউকে মুছে ফেলতে পারে?
আখেনাতেন ছিলেন প্রাচীন মিশরের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত সংস্কারকদের একজন। তিনি এমন এক সময়ে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, যখন সেই ব্যবস্থা হাজার বছরের ঐতিহ্য ও ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
তাঁর জীবদ্দশায় তিনি মিশরের ধর্মীয় কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসা শাসকেরা সেই পরিবর্তনকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর নাম ও প্রতিকৃতি মুছে ফেলা হয়, তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজধানী পরিত্যক্ত হয় এবং তাঁর শাসনকালকে ইতিহাসের মূল ধারার বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়।
তবু তাঁকে পুরোপুরি বিস্মৃত করা সম্ভব হয়নি। আমার্নার ধ্বংসাবশেষ, শিলালিপি ও শিল্পকর্ম বহু শতাব্দী পর তাঁর অস্তিত্ব ও কর্মের সাক্ষ্য নিয়ে ফিরে এসেছে।
আখেনাতেনের কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতাবানেরা ইতিহাসের স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু অতীতের সব চিহ্ন চিরতরে নিশ্চিহ্ন করা সহজ নয়। কখনো কখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা একটি নামও হাজার বছর পর ফিরে আসে নতুন আলোয়।
ইতিহাসের এই হারানো অধ্যায় তাই শুধু একজন ফারাওয়ের উত্থান-পতনের কাহিনি নয়; এটি ক্ষমতা, ধর্ম, স্মৃতি এবং বিস্মৃতির মধ্যকার দীর্ঘ সংঘাতেরও এক অসাধারণ উপাখ্যান।