কবি সালমা আক্তার চাঁদনীর কবি পরিচিতি ও সংক্ষিপ্ত জীবনী
জন্ম, পরিবার ও বংশপরিচয়
কবি সালমা আক্তার চাঁদনী বাংলাদেশের একজন কবি ও শিক্ষিকা। তিনি ১৯৯৭ সালের ২০ মে খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং ইউনিয়নের আচালং ডি.পি. পাড়া গ্রামে খাদিম বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম তমিজ উদ্দিন এবং মাতার নাম রহিমা বিবি।
শৈশব থেকেই তাঁর জীবন ছিল নানা প্রতিকূলতা ও সংগ্রামে পরিপূর্ণ। অল্প বয়সে পিতাকে হারানোর বেদনা, আর্থিক সংকট এবং শিক্ষাজীবনের নানা বাধা অতিক্রম করে তিনি নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁর জীবনের অন্যতম শক্তি ছিল আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস, ধৈর্য ও নিরন্তর প্রচেষ্টা।
শিক্ষাজীবন: দুঃখ-কষ্ট পেরিয়ে সাফল্যের পথে
ছোটবেলা থেকেই সালমা আক্তার চাঁদনীর মনে ইসলামি চিন্তাভাবনার প্রতি আগ্রহ ছিল। এ কারণে তাঁর বাবা তাঁকে মাদ্রাসায় ভর্তি করান। অল্প বয়সে পাড়ার মসজিদে তিনি কুরআন শিক্ষা লাভ করেন। পাশাপাশি বাড়িতে একজন লজিং শিক্ষিকার কাছে সাধারণ শিক্ষারও সুযোগ পান।
তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরুটা সহজ হলেও পিতার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার পর পরিবারের ওপর নেমে আসে গভীর সংকট। বাবাকে হারিয়ে তিনি অসহায় হয়ে পড়েন। তাঁর মা অশেষ কষ্ট স্বীকার করে তিন ভাইবোনের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সংসারের অভাব-অনটন ও মানসিক কষ্ট নীরবে সহ্য করে সালমা আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতেন। তাঁর নানা তাঁদের আগলে রাখার চেষ্টা করতেন।
২০০৭ সালে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে মেধাবী ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও তিনি বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। এ ঘটনা তাঁর মনে গভীর কষ্টের জন্ম দেয়। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ২০১০ সালে তিনি জেডিসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং থানার ভালো ফলাফল অর্জনকারীদের মধ্যে স্থান করে নেন।
২০১১ সালে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর ভাইদের পড়াশোনার কথা চিন্তা করে তিনি নিজের পড়াশোনা বন্ধ করে দেন। তাঁর ভাই খাগড়াছড়ি জেলা শহরের ইসলামিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় এতিমখানায় থেকে পড়াশোনা করতেন। পরিবারের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করলেও তিনি নিজের কষ্টের কথা নীরবে আল্লাহর কাছে তুলে ধরতেন।
সালমা আক্তার চাঁদনী ২০১১ সালকে নিজের জীবনের অনুপ্রেরণার বছর হিসেবে মনে করেন। সে সময় বাড়ির পাশের একটি ছোট জঙ্গলে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি কাঁদতেন। একই সঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী এবং বিভিন্ন মনীষীর জীবনকথা পড়ে সান্ত্বনা খুঁজতেন। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস সঞ্চয় করতেন।
২০১১ সালের শেষদিকে তাঁর মাদ্রাসা থেকে খবর আসে—তিনি যেন আবার পরীক্ষায় অংশ নেন; শিক্ষকেরা তাঁর পাশে থাকবেন। শিক্ষকদের আশ্বাসে তিনি নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন এবং বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দশম শ্রেণিতে ওঠেন।
দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ভালো ফলাফলের আশায় তিনি মাদ্রাসার ইংরেজি শিক্ষিকার বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। ওই শিক্ষিকা তাঁকে নিজের বোনের মতো স্নেহ করতেন এবং পড়াশোনার জন্য অনুপ্রেরণা, পরিশ্রম ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়াতেন। মায়ের কাছ থেকে কিছু খরচ পেলেও বাকি প্রয়োজন মেটাতে শিক্ষিকা তাঁকে সাহায্য করতেন। তাঁর এই সহযোগিতা সালমার জীবনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
দাখিল পরীক্ষার আগে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করে পড়াশোনা করেন। তাঁর মনের গভীরে ছিল মায়ের ও শিক্ষিকার মর্যাদা রক্ষা করার আকাঙ্ক্ষা। ২০১৩ সালে দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার পর তিনি নানাবাড়িতে চলে যান। ফলাফলের চিন্তায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফল প্রকাশের দিন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। নানাবাড়ির পেছনে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় বসে বৃষ্টির পানির সঙ্গে চোখের পানিও ঝরছিল তাঁর। মনে একটাই প্রশ্ন—তিনি কি ভালো ফল করতে পারবেন?
অবশেষে বাড়ি থেকে খবর আসে, তিনি জিপিএ-৫ (এ+) পেয়েছেন। বহুদিনের কষ্ট, দুশ্চিন্তা ও প্রার্থনার পর এই সাফল্যের সংবাদে তিনি আনন্দে কেঁদে ফেলেন। তাঁর কান্না দেখে আশপাশের মানুষও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
এরপর তিনি তবলছড়ি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখানেও তাঁকে লজিং থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়। নানা অনীহা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। লজিংয়ের বাড়িতে পড়ানো ও টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতেন। এতে পড়াশোনার ক্ষতি হলেও তিনি থেমে থাকেননি। ২০১৫ সালে তিনি আলিম পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রত্যাশিত ফল না পেলেও তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত থাকে।
এরপর ২০১৫ সালেই তিনি কুমিল্লা আলিয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসায় ফাজিল প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। ২০১৬ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২০ সালে কামিল ও অনার্সের পড়াশোনা শেষ করেন। করোনার কারণে মাস্টার্স সম্পন্ন করতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময় লাগে।
কর্মজীবন: শিক্ষকতার প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ
সালমা আক্তার চাঁদনী ২০১৬ সালে কুমিল্লা ইক্বরা স্কুল অ্যান্ড মাদ্রাসায় কর্মজীবন শুরু করেন। এর আগেই, ২০১৫ সাল থেকে টিউশনি ও অন্যান্য কাজের মাধ্যমে নিজের ব্যয় নির্বাহের চেষ্টা করতেন। পড়াশোনা, সংসার ও চাকরির দায়িত্ব সামলে শহুরে জীবনে টিকে থাকা তাঁর জন্য সহজ ছিল না।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২২ সালে তিনি কুমিল্লা হলিক্রিসেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে যোগ দেন। পরবর্তীতে ২০২৬ সালে আবু বকর আস-সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মাদ্রাসায় বাংলা বিষয়ের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।
শিক্ষকতা তাঁর কাছে কেবল একটি পেশা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার দায়িত্বও। তিনি শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, স্নেহ ও আন্তরিকতার সঙ্গে পড়ান। প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো কঠোর ভাষায় শাসন করেন, কখনো কোমলভাবে বোঝান, আবার কখনো উপদেশ ও নির্দেশনার মাধ্যমে সঠিক পথে চলতে উৎসাহিত করেন।
মাতৃত্ব ও পারিবারিক জীবন
অনার্সের প্রথম বর্ষে পড়ার সময় ২০১৭ সালে সালমা আক্তার চাঁদনীর কোলজুড়ে আসে তাঁর প্রথম সন্তান, একটি পুত্রসন্তান। ৯ অক্টোবর তিনি অনার্সের প্রথম পরীক্ষায় অংশ নেন এবং পরদিন, ১০ অক্টোবর, সন্তানের মা হন। ছেলের নাম রাখেন আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ।
মাতৃত্বের নতুন দায়িত্বের মধ্যেও তিনি বাকি পরীক্ষাগুলো শেষ করেন। সন্তান জন্মদান ও পড়াশোনার চাপ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে তাঁর ফলাফলে প্রত্যাশিত প্রতিফলন ঘটেনি। তবুও প্রতিকূলতার কাছে আত্মসমর্পণ না করে তিনি সামনে এগিয়ে যান।
২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাঁর দ্বিতীয় সন্তান, একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। তার নাম রাখেন জুয়াইরিয়া হোসাইন নোভা।
দুই সন্তানকে লালন-পালন, সংসারের দায়িত্ব এবং পেশাগত জীবন—সবকিছু সামলে তিনি নিরলসভাবে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর জীবনসংগ্রামে মাতৃত্ব যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, তেমনি এটি তাঁর দায়িত্ববোধ ও অধ্যবসায়েরও পরিচায়ক।
সাহিত্যচর্চার সূচনা ও প্রকাশিত লেখা
সালমা আক্তার চাঁদনী লেখালেখি করতেন আগে থেকেই। তবে ২০২১ সালের দিকে কবি রাজিব হাসানের সঙ্গে পরিচয়ের পর পত্রিকায় লেখা পাঠানোর ক্ষেত্রে তিনি উৎসাহ ও দিকনির্দেশনা পান। তাঁর হাত ধরেই সালমা পত্রিকায় লেখা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতার নাম ‘বন্ধু’।
এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ম্যাগাজিনে তাঁর কবিতা ও অনুগল্প প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের পরিচিত একটি মাদ্রাসাভিত্তিক প্রকাশনা, ছারছীনা থেকে প্রকাশিত ‘কুড়িমুকুল’ ম্যাগাজিনেও তাঁর কবিতা ও অনুগল্প স্থান পেয়েছে।
প্রকাশিত গ্রন্থ ও সাহিত্যিক অর্জন
সালমা আক্তার চাঁদনীর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে একাধিক যৌথ কাব্যগ্রন্থ ও গল্পগ্রন্থ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো—
১. অগ্রযাত্রা — যৌথ কাব্যগ্রন্থ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৬তম জন্মদিন উপলক্ষে উপহার হিসেবে প্রকাশিত এই সংকলনে বহু কবির কবিতা স্থান পেয়েছিল। ২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর ঢাকার সেগুনবাগিচার শিল্পকলা একাডেমি থেকে তিনি বই, সনদপত্র ও ক্রেস্ট গ্রহণ করেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
২. সেই তুমি — দ্বিতীয় খণ্ড — যৌথ কাব্যগ্রন্থ।
৩. নিদ্রিতা — যৌথ কাব্যগ্রন্থ।
৪. গল্পকথা — যৌথভাবে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ।
এ ছাড়াও বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে তাঁর কবিতা ও অনুগল্প প্রকাশিত হয়েছে। যৌথ গ্রন্থে অংশগ্রহণ এবং সাময়িকীতে লেখা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি সাহিত্যজগতে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
আদর্শ, ব্যক্তিত্ব ও সমাজভাবনা
সালমা আক্তার চাঁদনীর আদর্শ হলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি মিষ্টভাষী এবং মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
নিজের জীবনে দুঃখ-কষ্ট, আর্থিক সংকট ও নানা প্রতিকূলতার অভিজ্ঞতা তাঁকে বাস্তবজীবনের কঠিন দিকগুলো কাছ থেকে দেখতে শিখিয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের আলোকে তিনি সমাজের অসংগতি দূর করার স্বপ্ন দেখেন।
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও প্রত্যাশা
সালমা আক্তার চাঁদনীর স্বপ্ন, একদিন তিনি সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করতে ভূমিকা রাখবেন। শিক্ষা, সাহিত্য ও নৈতিক মূল্যবোধের মাধ্যমে মানুষের চিন্তাভাবনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চান তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিকে কাজে লাগিয়ে সমাজের কল্যাণে অবদান রাখাই তাঁর প্রত্যাশা।
শৈশবের দুঃখ-কষ্ট, পিতৃহারা জীবনের বেদনা, আর্থিক সংকট, শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তা, মাতৃত্ব ও কর্মজীবনের বহুমুখী দায়িত্ব—সবকিছুর মধ্য দিয়েও সালমা আক্তার চাঁদনী এগিয়ে চলেছেন। তাঁর জীবনকাহিনি অধ্যবসায়, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে থাকার এক ব্যক্তিগত আখ্যান।
কবির ফেসবুক প্রোফাইল
কবি সালমা আক্তার চাঁদনীর ফেসবুক প্রোফাইল