বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক মোহাম্মদ আলমগীরের কবি পরিচিতি ও জীবনী
কবি, ঔপন্যাসিক, ছন্দগবেষক, গ্রন্থকার, সম্পাদক ও সাহিত্যসংগঠক
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
কবি-সাহিত্যিক মোহাম্মদ আলমগীর ১২ জানুয়ারি ১৯৯৩ সালে চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের মাইজবিলা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম দলিলুর রহমান এবং মাতার নাম নুর বানু।
দারিদ্র্য ও আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্য দিয়ে তাঁর শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়। সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পেলেও জ্ঞানার্জন ও সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ অটুট ছিল।
শিক্ষাজীবন ও প্রবাসজীবন
শৈশবে মক্তবে পবিত্র কোরআন শিক্ষার মাধ্যমে তাঁর ধর্মীয় শিক্ষার সূচনা হয়। পরে মাদরাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হলেও পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে মাত্র দুই মাস পরই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।
জীবিকার তাগিদে তিনি চট্টগ্রাম শহরের একটি খাবারের হোটেলে কাজ করেন। ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪ সালে জীবিকার সন্ধানে ওমানে পাড়ি জমান। সেখানে প্রায় নয় বছর অবস্থানকালে রাখালের কাজসহ বিভিন্ন শ্রমসাধ্য দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিকূল পরিবেশেও নিজের উদ্যোগে বই সংগ্রহ, অধ্যয়ন ও সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যান।
সাহিত্যচর্চার সূচনা
মোহাম্মদ আলমগীরের নিয়মিত সাহিত্যচর্চার সূচনা ২০১৮ সালে, ওমানে অবস্থানকালে। ফেসবুকে চরমোনাইয়ের পীরকে নিয়ে রচিত একটি কবিতা পড়ে তিনি কবিতার গঠন, ছন্দ ও অন্ত্যমিল সম্পর্কে আগ্রহী হন। এরপর নিজেই কবিতা লেখা শুরু করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে থাকেন।
শতাধিক কবিতা লেখার পর এক ফেসবুক বন্ধুর কাছ থেকে ছন্দ ও মাত্রার গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারেন। তখন নিজের কবিতাগুলো নতুনভাবে মূল্যায়ন করে ছন্দ শেখার সিদ্ধান্ত নেন। এভাবেই তাঁর ছন্দশিক্ষা ও গবেষণার পথচলা শুরু হয়।
ছন্দশিক্ষা, গবেষণা ও আত্মপ্রতিষ্ঠা
ছন্দবিষয়ক জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি বাংলাদেশ থেকে কুরিয়ারে বিভিন্ন বই সংগ্রহ করেন এবং ইন্টারনেটের সহায়তায় নিয়মিত অধ্যয়ন ও অনুশীলন চালিয়ে যান। ওমানে রাখালের কাজের পাশাপাশি তিনি ছন্দ ও মাত্রা নিয়ে পড়াশোনা করতেন। কখনো গভীর রাত পর্যন্ত, কখনো ফজরের আজান শোনা পর্যন্ত চলত তাঁর অধ্যয়ন।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আত্মপ্রচেষ্টা, অধ্যবসায় ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি বাংলা কবিতার ছন্দবিষয়ক জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করেন। প্রচলিত ছন্দের নিয়ম ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে চর্চার পাশাপাশি ছন্দের নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
সাহিত্যচর্চায় অধিক সময় দেওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক পরিসরে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও সাহিত্যসাধনা অব্যাহত রাখেন।
বিনামূল্যে ছন্দশিক্ষা ও কবি গঠনে অবদান
ছন্দবিষয়ক জ্ঞান অর্জনের পর মোহাম্মদ আলমগীর ফেসবুক মেসেঞ্জারে কবিতার ক্লাস পরিচালনা শুরু করেন। বিভিন্ন সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কবিতার বিচার কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ছন্দশিক্ষাও দিতেন।
নবীন ও উদীয়মান কবিদের ছন্দ, মাত্রা, অন্ত্যমিল ও কবিতার গঠন শেখানোর উদ্দেশ্যে তিনি বিনামূল্যে শত শত কবিকে পাঠদান করেছেন বলে তাঁর দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়। শিক্ষার্থীদের অনুরোধ ও উৎসাহে পরবর্তী সময়ে তিনি ছন্দবিষয়ক গ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করেন।
ছন্দবিষয়ক গ্রন্থ
বাংলা কবিতায় ছন্দচর্চার প্রসার এবং কবিদের ছন্দজ্ঞান সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে মোহাম্মদ আলমগীর এককভাবে তিনটি ছন্দবিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছেন।
১. ছন্দ শিক্ষার বই ২. ছন্দের অস্তিত্ব ৩. ছন্দের রূপ-যৌবন
২০২০ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ ছন্দ শিক্ষার বই প্রকাশিত হয়। শিক্ষার্থীদের আগাম অর্ডার ও অর্থায়নে বইটির ২০০ কপি প্রকাশের ব্যবস্থা হয়।
পরবর্তী সময়ে ঐকতান প্রকাশন থেকে তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ছন্দের অস্তিত্ব প্রকাশিত হয়। প্রকাশকের নিজস্ব উদ্যোগ ও অর্থায়নে বইটির ২০০ কপি মুদ্রিত হয়।
তাঁর তৃতীয় গ্রন্থ ছন্দের রূপ-যৌবন রচনা সম্পন্ন হলেও ব্যক্তিগত ও মানসিক প্রতিকূলতার কারণে এখনো প্রকাশিত হয়নি।
সাহিত্যজীবনের প্রতিকূলতা
সাহিত্যচর্চা ও ছন্দশিক্ষার মাধ্যমে মোহাম্মদ আলমগীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি অর্জন করেন। তবে একপর্যায়ে তাঁর ছন্দশিক্ষার ক্লাসে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে তাঁকে নিয়ে সমালোচনা ও অভিযোগ উত্থাপিত হয়।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আবু বক্কর সিদ্দিক নামের এক লেখকসহ কয়েকজন ব্যক্তি ফেসবুকে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, বার্তা আদান-প্রদানের স্ক্রিনশট প্রকাশের মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি করা হয়। এসব ঘটনার ফলে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন এবং ছন্দের রূপ-যৌবন গ্রন্থের প্রকাশনা স্থগিত হয়ে যায়।
এটি তাঁর সাহিত্যজীবনের একটি প্রতিকূল অধ্যায়। তবে স্থানীয় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ ও তাঁর সাবেক মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষকের কাছ থেকে সাহিত্যকর্মের প্রশংসা ও উৎসাহও পেয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
ইসলামি সাহিত্য ও গবেষণা
বাংলা সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি ইসলামি জ্ঞান ও সামাজিক সচেতনতামূলক বিষয়েও মোহাম্মদ আলমগীরের আগ্রহ রয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি এককভাবে সাতটি ইসলামি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে চারটি প্রকাশিত এবং তিনটি অপ্রকাশিত।
প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো—
১. পিতা-মাতার অধিকার ২. পর্দা নারীর অলংকার ৩. যৌতুকের বিরুদ্ধে লড়াই ৪. ইমাম মাহদী ও দাজ্জালের আগমন
এসব গ্রন্থে পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য, ইসলামি মূল্যবোধ, সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ ও ধর্মীয় সচেতনতার মতো বিষয় স্থান পেয়েছে। তাঁর প্রথম ইসলামি গ্রন্থ পিতা-মাতার অধিকার।
ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ
কবিতা ও ছন্দবিষয়ক গ্রন্থের পাশাপাশি কথাসাহিত্যেও মোহাম্মদ আলমগীরের অবদান রয়েছে। তাঁর রচিত ধারাবাহিক উপন্যাসগুলো হলো—
১. জান্নাতি পরিবার ২. জান্নাতি রমণী ৩. ওগো প্রিয় প্রেয়সী ৪. ধর্ষণের পর হত্যা ৫. রূপ নগরের রাজকন্যা — প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড ৬. বিশ্বাসঘাতক তরুণী ৭. অপছন্দের ভালোবাসা ৮. ভাগ্যের পরিহাস ৯. দুই খুঁটির সংসার
এসব উপন্যাসে পারিবারিক সম্পর্ক, ভালোবাসা, বিশ্বাস, প্রতারণা ও সামাজিক বাস্তবতার বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা
নিজের সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি অন্য কবিদের সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করতে মোহাম্মদ আলমগীর কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনায়ও যুক্ত রয়েছেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ছয়টি কাব্যগ্রন্থ হলো—
১. মা আমিনার কোলে চাঁদ ২. বহু রঙের ভাব ৩. মা আমার স্বর্গ ৪. কবিতার বাতায়ন ৫. কবির মনের কথা ৬. দুই বাংলার কাব্যমালা
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব গ্রন্থের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ১৬০ জন কবি তাঁদের কবিতা প্রকাশের সুযোগ পেয়েছেন।
সাংগঠনিক ভূমিকা
মোহাম্মদ আলমগীর আন্তর্জাতিক কবি-সাহিত্যিক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন সাহিত্য পরিষদের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
নবীন কবিদের ছন্দশিক্ষা, কবিতা রচনার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাংলা কবিতায় ছন্দের যথাযথ প্রয়োগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি তাঁর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ব্যক্তিজীবন ও পারিবারিক জীবন
প্রায় নয় বছরের প্রবাসজীবন শেষে মোহাম্মদ আলমগীর ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সালে দেশে ফিরে আসেন। ১২ ডিসেম্বর ২০২৩ সালে তিনি শাহনাজ পারভীনকে বিবাহ করেন। বিবাহের সময় তাঁর স্ত্রী মাদরাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন।
২৮ অক্টোবর ২০২৪ সালে তাঁদের পুত্রসন্তান মো. আসাদুল্লাহর জন্ম হয়। শিশুটির জন্মস্থান লোহাগাড়া জেনারেল হাসপাতাল।
মোহাম্মদ আলমগীরের জন্মস্থান চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের মাইজবিলা গ্রাম। তাঁর স্ত্রী শাহনাজ পারভীনের পৈতৃক বাড়ি একই উপজেলার পূর্ব কলাউজান ইউনিয়নের মিয়াজী পাড়ায়। এটি তাঁর স্ত্রীর বাবার বাড়ির ঠিকানা, মোহাম্মদ আলমগীরের নিজস্ব ঠিকানা নয়।
সাহিত্যদর্শন ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
মোহাম্মদ আলমগীরের সাহিত্যজীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য আত্মপ্রচেষ্টা, অধ্যবসায় ও ছন্দচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগ। সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যেও তিনি স্বশিক্ষা, গবেষণা ও অনুশীলনের মাধ্যমে সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রেখেছেন।
ছন্দবিষয়ক গ্রন্থ রচনা, বিনামূল্যে কবিতার ক্লাস পরিচালনা, ইসলামি গ্রন্থ রচনা, উপন্যাস রচনা ও কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি সাহিত্যজগতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। ভবিষ্যতে বাংলা কবিতায় ছন্দচর্চার প্রসার এবং নবীন কবিদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে আরও ভূমিকা রাখাই তাঁর প্রত্যাশা।
যোগাযোগ
কবি-সাহিত্যিক মোহাম্মদ আলমগীরের ফেসবুক প্রোফাইল দেখতে
এখানে ক্লিক করুন
শুভকামনায়
কবি মুফতি মুহাম্মাদ আবদুল হাই